ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুগন্ধার ভাঙনে হুমকির মুখে বরিশাল বিমানবন্দর

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৯-০৯-২০২৬ ০২:৫০:৫১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৯-০৯-২০২৬ ০৩:১৪:১১ অপরাহ্ন
সুগন্ধার ভাঙনে হুমকির মুখে বরিশাল বিমানবন্দর ছবি : সংগৃহীত
বরিশালের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ভাঙন নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত থেকে উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের বাজারসংলগ্ন এলাকায় শুরু হওয়া ভাঙনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে পুরোনো মসজিদ, দুটি বসতভিটা, দুটি দোকান, গাছপালা ও বাবুগঞ্জ খেয়াঘাটের গণশৌচাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন অব্যাহত থাকায় এখন প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজার, বরিশাল বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে। 

গত বছর নদীভাঙনের কবলে পড়ে একটি পুরোনো মসজিদ বিলীন হয়। পরে নির্মাণ করা নতুন মসজিদটিও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে। সেটি রক্ষায় বাঁশের চাটাই ও পাইলিং দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন পশ্চিম ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের বাসিন্দারা।

নদীগর্ভে চলে গেছে রান্নাঘর ও চুলা। এবার বসতঘরটিও চলে যাওয়ার উপক্রম। বাধ্য হয়ে ঘরের বারান্দা খুলে অন্যের বাড়িতে রেখে দিয়েছেন ইটভাটা শ্রমিক সরোয়ার হোসেন ও গৃহিণী সুমি বেগম দম্পতি। তবে রান্না তো বন্ধ রাখা যায় না। তাই বসতঘরের পাশেই নদীর পাড়ে নতুন মাটির চুলা তৈরি করছেন সুমি।

চুলা তৈরির ফাঁকে সুমি বেগম বলেন, ‘পাঁচবার ভাঙনের পর এইহানে ঘর তুলছিলাম। তাও ভাঙনে নিতেছে। ঘরের বারান্দা খুইলা অন্য মানুষের বাড়িতে রাখছি। এহন আমাগো আর অন্য কোথাও যাওনের জায়গা নাই। তাই বাচ্চা লইয়া এইহানেই আতঙ্কে নির্ঘুম রাইত কাডাই।’

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের এ দম্পতির মতো শত শত পরিবার এখন সুগন্ধা নদীর ভাঙন আতঙ্কে দিন-রাত কাটাচ্ছে। একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়ে নতুন করে ঘর তুললেও এবার সেই ঘরও নদীগর্ভে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সুগন্ধা নদীর তীরে বিভিন্ন স্থানে তীব্র ভাঙন চলছে। পাড়ের বড় বড় মাটির খণ্ড ধসে নদীতে পড়ছে। ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় স্থানীয়রা নিজেদের মতো করে স্থাপনা ও মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। 

স্থানীয়রা জানান, পশ্চিম ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের শতাধিক পরিবার একাধিকবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে। একই গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান হাওলাদার বলেন, ‘এই গ্রামের শতাধিক পরিবার একাধিকবার ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে। আর ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট ভাঙলেই বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেয়াল নদীগর্ভে চলে যাবে।’

সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘দিন আনি দিন খাই। ইটভাটায় কাম কইরা কয় টাহা কামাই। পাঁচবার বাড়ি ভাঙনের পর এহন আবার নতুন ভাঙন শুরু হইছে। বউ-বাচ্চা লইয়া দিন-রাইত আতঙ্কে কাটাই।’
 
একই গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান হাওলাদার বলেন, ‘এই গ্রামের শতাধিক পরিবার একাধিকবার ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে। আর ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট ভাঙলেই বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেয়াল নদীগর্ভে চলে যাবে।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিনের ভাঙনে ইতোমধ্যে অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়েছে। এক বছর আগে ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে ওই এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। তবে চলতি বছরের ভাঙনে সেগুলোর অনেকটাই নদীগর্ভে চলে গেছে।

ভাঙনের কবলে পড়েছে খেয়াঘাটে যাতায়াতের সংযোগ সড়কও। ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পন্টুন। ভাঙন অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যে আরও স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বিপ্লব মিস্ত্রি বলেন, দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে এর প্রভাব বাবুগঞ্জ বাজারেও পড়বে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি কয়েকশ মানুষের বসতভিটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সমাজসেবক মোয়াজ্জেম বিশ্বাস বলেন, বছরের পর বছর বাবুগঞ্জ বাজার ও আশপাশের ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এবার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দ্রুত বাজার ও বসতবাড়ি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু না হলে ধীরে ধীরে বাবুগঞ্জ বাজার, কয়েকটি মসজিদ, বাবুগঞ্জ থানা এবং সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজারও তখন নদীগর্ভে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। 

বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, বাবুগঞ্জে সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদী রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ৩টি নদীরই বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করা হয়েছে।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, বাবুগঞ্জ লঞ্চঘাট এলাকার সুগন্ধা নদীর বাম তীরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। সুগন্ধা বরিশালের বড় নদীগুলোর একটি। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীটিতে ব্যাপক ভাঙন হচ্ছে। বাবুগঞ্জের এই অংশের জন্য ইতোমধ্যে সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি বলেন, সমীক্ষার ভিত্তিতে সুগন্ধা নদীর বাম তীরের প্রায় ৩ হাজার ৬২৬ মিটার এলাকায় সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ পেয়েছে। এখন একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চলতি মাসেই প্রকল্পটি অনুমোদন হবে বলে তারা আশাবাদী।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা বলেন, ভাঙনের ছবি ও স্থানীয়দের বক্তব্যসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ বা নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়রা বলছেন, ৩ হাজার ৬২৬ মিটার তীর রক্ষার স্থায়ী প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কিন্তু নদীভাঙন অপেক্ষা করবে না। তাই স্থায়ী প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই জিও ব্যাগ, বালুভর্তি বস্তাসহ জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তাদের আশঙ্কা, এখনই ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সুগন্ধা আরও ভেতরে ঢুকে পড়বে। এতে বসতভিটা, মসজিদ, দোকান, খেয়াঘাটের পন্টুন ও সংযোগ সড়কের পর নদীগর্ভে চলে যেতে পারে প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ঝুঁকিতে পড়তে পারে বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেয়ালও।

এখন স্থানীয়দের চোখ একদিকে নদীর ভাঙনের দিকে, অন্যদিকে সুগন্ধার ৩ হাজার ৬২৬ মিটার তীর রক্ষার স্থায়ী প্রকল্পের একনেকে অনুমোদনের দিকে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ